ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশের মতো রাজশাহীতেও দ্রুত বাড়ছে নির্বাচনি উত্তাপ। জেলার নয় উপজেলা নিয়ে গঠিত ছয়টি সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে নেমে পড়ায় পুরো এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর রাজনৈতিক পরিবেশ। তবে এই উত্তাপের মধ্যেই বিএনপির চারটি আসনে মনোনয়নবঞ্চিতদের ক্ষোভ, বিক্ষোভ ও সংঘাত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী দলীয় ঐক্য অটুট রেখে ধারাবাহিক গণসংযোগ ও সংগঠিত প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনি মাঠে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে।
রাজশাহীর ছয়টি আসনেই এবার বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের মতে, এই নির্বাচন দুই দলের জন্যই কার্যত ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ একাধিক ছোট দলও মাঠে সক্রিয় রয়েছে। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি আসনেই প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ভোটের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও সেখানে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই এবং দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিন। তবে তাকে প্রার্থী হিসেবে মানতে নারাজ মনোনয়নপ্রত্যাশী সুলতানুল ইসলাম তারেকের সমর্থকেরা। তারা নিয়মিত বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে এবং শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তনের আশায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে জামায়াত এ আসনে কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমানকে প্রার্থী করে অনেক আগেই মাঠে নেমেছে। ১৯৮৬ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়া এই প্রবীণ নেতা এবারও জয় নিয়ে আশাবাদী। পাশাপাশি একাধিক ছোট দলের প্রার্থীর উপস্থিতিতে এই আসনটি বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে যাচ্ছে।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সিটি মেয়র মিজানুর রহমান মিনুকে মনোনয়ন দেওয়ার পর আপাতত দলীয় কোন্দল কমেছে। শাহ মখদুম (র.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেছেন। জামায়াত এখানে মহানগর নায়েবে আমির ডা. জাহাঙ্গীরকে প্রার্থী করেছে। তিনি ওয়ার্ড ও মহল্লাভিত্তিক গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ আসনেও একাধিক বাম ও ইসলামী দলের প্রার্থীর অংশগ্রহণ ভোটের মাঠকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তুলছে।
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলনকে ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে দুই মনোনয়নপ্রত্যাশীর সমর্থকেরা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছেন। এতে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অপরদিকে জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় পাঁচবারের ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়াকে ঘিরে ক্ষোভ চরমে। উপজেলা বিএনপির ৩৭ জন নেতা সরাসরি দলীয় প্রধানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রার্থীর অনুসারীদের কারণে এলাকায় ভয়ভীতি তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনি প্রচারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সুযোগে জামায়াত প্রার্থী ডা. আবদুল বারি সরদার চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করছেন।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে সবচেয়ে তীব্র আন্দোলন চলছে। প্রবীণ নেতা নজরুল ইসলাম মণ্ডলের মনোনয়নের বিরুদ্ধে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর সমর্থকেরা নিয়মিত বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। বিপরীতে জামায়াতের নূরুজ্জামান লিটন সংগঠিতভাবে মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন।
রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদের বিরুদ্ধে আপাতত প্রকাশ্য বিরোধিতা নেই। জামায়াত এখানে অধ্যক্ষ নাজমুল হককে প্রার্থী করে সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরে সক্রিয় প্রচারণা শুরু করেছে।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্যেও অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। কেউ বলছেন, বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, আবার কেউ মনে করছেন জামায়াতের সংগঠিত প্রচারণা এবার নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যদি বিএনপি দ্রুত দলীয় কোন্দল সামাল দিতে না পারে, তাহলে রাজশাহীর একাধিক আসনে ফলাফল তাদের প্রত্যাশার বিপরীত হতে পারে। সব মিলিয়ে রাজশাহীতে এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে সবচেয়ে জমজমাট ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ লড়াইগুলোর একটি।



