দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলতি শিক্ষাবর্ষের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। শীতকালীন ছুটি চললেও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই রাজধানীসহ সারা দেশে কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট ব্যাচগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার আগেই কোচিংয়ের জন্য শিক্ষার্থী ‘বুকিং’ শুরু হয়, যা শিক্ষা ব্যবস্থায় কোচিংনির্ভরতার চরম চিত্র তুলে ধরছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্য এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যালয়ের ক্লাসের চেয়ে কোচিং সেন্টারই হয়ে উঠেছে মূল শিক্ষাকেন্দ্র। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়েরই আগ্রহ কমছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত সার্টিফিকেট প্রদানের প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০১২ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ প্রণয়ন করে, যা ২০১৯ সালে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ওই নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়, কোনো শিক্ষক নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না এবং কোনো বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। নীতিমালা ভঙ্গ করলে এমপিও স্থগিত বা বাতিল, বেতন-ভাতা বন্ধ, পদাবনতি কিংবা বরখাস্তসহ কঠোর শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব শাস্তির নজির প্রায় নেই বললেই চলে।
নীতিমালায় বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠনের কথা থাকলেও এসব কমিটির কার্যক্রম কার্যত অদৃশ্য। মাঠপর্যায়ে কোনো তদারকি না থাকায় কোচিং বাণিজ্য দিন দিন আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর নামকরা স্কুল ও কলেজগুলোর আশপাশে গড়ে উঠেছে শত শত কোচিং সেন্টার, যেগুলোর বেশির ভাগই পরিচালিত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা তাঁদের ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালেই কোচিং সেন্টারগুলো ভর্তি কার্যক্রম শুরু করে এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণি শিক্ষকরা নিজস্ব প্রাইভেট ব্যাচে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। প্রাইভেটে না পড়লে ক্লাসে অবহেলা, পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়া কিংবা মানসিক চাপের অভিযোগও করেন অভিভাবকরা। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় করে সন্তানদের কোচিং ও প্রাইভেটে ভর্তি করাতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।
এই অতিরিক্ত খরচ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর পেছনে মাসে কয়েক হাজার থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে দশ হাজার টাকার বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা হয়ে উঠছে ব্যয়বহুল এবং দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে।
শিক্ষা ও শিশু মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত কোচিং ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। স্কুল শেষে একের পর এক কোচিং ও প্রাইভেটে অংশ নিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম, খেলাধুলা ও পারিবারিক সময় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পড়াশোনার চাপের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে।
এদিকে কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার কারণে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মানও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অনেক শিক্ষক কোচিংয়ে যেসব বিষয় পড়ান, সেগুলো শ্রেণিকক্ষে সংক্ষেপে বা অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগ হারায় এবং কোচিং ছাড়া ভালো ফল সম্ভব নয়—এমন ধারণা গড়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নতুন করে উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বর্তমান সরকার। সম্প্রতি প্রকাশিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা–২০২৫-এ শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান নীতিমালার দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেটিকে যুগোপযোগী করার প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।
শিক্ষা উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, শুধু নীতিমালা করলেই হবে না; কেন ২০১২ সালের নীতিমালা বাস্তবায়ন হয়নি, তার কারণ অনুসন্ধান করে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অভিভাবক সংগঠনগুলোর দাবি, নীতিমালা নয়, সরাসরি আইন করে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে এবং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের মতে, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না করা গেলে কোচিংনির্ভরতা কমবে না এবং শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকট আরও গভীর হবে।



