ফেনীতে দ্বিতীয়বারের মতো জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার রাতে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভা ছড়িয়ে যায় শহরেও। লক্ষ্য জনতার উদ্দেশ্যে তিনি সমস্যা, সম্ভাবনা, আশা-প্রত্যাশার কথা যেমনি শুনিয়েছেন, তেমনি আয়োজন নিয়ে বিরক্তিও প্রকাশ করেছেন। চরম বিশৃঙ্খলা নিয়ে বিরক্ত হলেও সাবলীল ভাষা আর স্বাভাবিক মেজাজে পরিস্থিতি সামলে নিলেও বক্তব্য সংক্ষেপ করেন। জনসভামঞ্চের মতোই বাইরের পরিস্থিতি নিয়ে বারবার বিরক্তি প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বক্তৃতার মাঝেই বিরক্ত হয়ে চেয়ারে বসে পড়ায়। এক পর্যায়ে তিনি সবাইকে শান্ত হয়ে বসে পড়ার অনুরোধ করেন, তা না হলে বক্তব্য শেষ করার ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি বলেন, এখানে কিন্তু আমার নানার বাড়ি, কথা না শুনলে বক্তব্য বন্ধ করে দেবো। এ কথা বলেই বক্তৃতা বন্ধ করে দিয়ে ক্ষণিকের জন্য একাকী চেয়ারে বসে পড়েন। পরে আবার উঠে মাইক হাতে নিয়ে কথা বললেও চেহারায় রাগ আর অভিমানের চাপ ফুটে ওঠে। একই অবস্থা মঞ্চের পাশে নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষমান বিগত ১৬ বছর গুম ও খুনের শিকার এবং ২০২৪-এর এক দফা আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও দেখা যায়। তিনি বক্তৃতা শেষ করে এসব মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে নেতাকর্মীরা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে তারা সেখানে ঢুকে পড়ে। বিজিবি, পুলিশ ও সিএসএফ সদস্যরা তখন তারেক রহমানকে নিরাপদে গাড়িতে তুলে দেন। এর আগে তারেক রহমান যখন বক্তৃতা করছিলেন তখন একদল পুরো নিরাপত্তা বেষ্টনী উপড়ে ফেলে মঞ্চের দিকে ছুটে যান। এক পর্যায়ে কয়েকজন মঞ্চেও উঠে পড়েন। জেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের সভাপতি সাইদুর রহমান জুয়েল একজনকে গলা চেপে ধরে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেন। এছাড়া মঞ্চে থাকা অন্য নেতারাও চাপ সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। এদিকে জনসভা মঞ্চ ও নিরাপত্তা বেষ্টনী নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের মতো তিন জেলার নেতাকর্মীরাও ক্ষুব্ধ। হুড়োহুড়ি আর সামনে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় পুরো শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে সভার শুরুতেই। তারেক রহমান মঞ্চে ওঠার পর সামনে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। এছাড়া বক্তৃতার ক্ষেত্রেও মানা হয়নি প্রটোকল। দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, জয়নাল আবদিন, যুগ্ম মহাসচিব শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার পর বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু। এ নিয়ে নেতাদের পাশাপাশি তাদের কর্মী সমর্থকরাও ক্ষোভ জানান। এসব কারণে অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ফেনীর সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলালও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। সাউন্ড সিস্টেম নিয়েও অভিযোগের শেষ নেই। অনেকের মোবাইল ও মানিব্যাগ চুরি হয়ে যায় সভাস্থল থেকে। এদিকে মঞ্চসহ পুরো সভার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের চুক্তি দেওয়া হয়েছিল জেলা আওয়ামী লীগের পলাতক সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সোহেলকে। এ কারণে অনেকে মনে করছেন জনসভা নিয়ে এক ধরনের নাশকতার চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্যদিকে ১৫ সাংবাদিকসহ অন্তত ৪০ জন আহত হলেও বিএনপির কোনো নেতা খোঁজ নেননি। তবে আহত নেতাকর্মীদের মঞ্চের অদূরে মসজিদের ভেতরে ৫ জনকে নিয়ে শুইয়ে রাখতে দেখা গেছে। এছাড়া ধস্তাধস্তি আর চেয়ার ছোড়াছুড়ির কারণে আমন্ত্রণ জানালেও শোনা হয়নি জুলাই যোদ্ধা ও শহীদদের পরিবারের বার্তা। তাদের সঙ্গে কয়েক সেকেন্ড কথা বলেই অনুষ্ঠানস্থল ছাড়েন তারেক রহমান। এছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামির ফেনী জেলা সভাপতি শায়খুল হাদিস হাফেজ মাওলানা মুফতি তাহের সাইদকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি মঞ্চে উঠতে পারেননি। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন ফেনী টেলিভিশন জার্নালিস্ট ক্লাবের সভাপতি আতিয়ার সজল। তিনি বলেন, পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া ও হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব অভিযোগ নিয়ে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন বলেন, অতি আবেগের কারণে কর্মীরা মঞ্চের দিকে ছুটে আসেন নেতাকে কাছ থেকে দেখার জন্য। বক্তব্যের ক্ষেত্রে প্রটোকল না মানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বড় শোডাউনের কারণে ভেঙে গেছে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার বলেন, বড় জনসভা হওয়ায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন ছিলেন নেতাকর্মীরা। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা দুঃখজনক। এ নিয়ে রফিকুল আলম মজনুর সঙ্গে কথা বলতে মুঠোফোনে একাধিক চেষ্টা করেও মোবাইল বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।



