মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০২৬
spot_img
Homeসারাদেশগোয়ালন্দে নির্মাণের ১৫ দিনে সোয়া কোটি টাকার সড়কে ধস! অনিয়মের অভিযোগ

গোয়ালন্দে নির্মাণের ১৫ দিনে সোয়া কোটি টাকার সড়কে ধস! অনিয়মের অভিযোগ

মোঃ তৌহিদুর রহমান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ধসে পড়তে শুরু করেছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হেরিং বোন বন্ড (HBB) সড়ক। ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের অন্তত ১৫ থেকে ২০টি স্থানে ধস দেখা দেওয়ায় কাজের মান, তদারকি এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সড়কটি দৌলতদিয়া আক্কাস আলী উচ্চ বিদ্যালয় পেছনে (পশ্চিম) থেকে আশ্রয়ন প্রকল্প হয়ে রিকাতের দোকান পর্যন্ত বিস্তৃত। চলতি বছরের ১০ জুন কাজ শেষ হওয়ার পর এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে বলে আশা করা হলেও, টানা বৃষ্টির পর সেই আশা এখন পরিণত হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশায়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ সড়ক টেকসইকরণের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ ৭৮ হাজার ৭২৫ টাকা এবং চুক্তিমূল্য ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৮ টাকা। কাজটি বাস্তবায়ন করে উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, আর কার্যাদেশ পায় মেসার্স লাকী এন্টারপ্রাইজ। গত ১২ মার্চ শুরু হয়ে ১০ জুন কাজ শেষ হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের ধস সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও গাইডওয়ালে ফাটল, কোথাও নিচের অংশ দেবে গেছে। অনেক জায়গায় ইট উঠে গিয়ে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির ইট ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া গাইডওয়ালের নিচে নির্ধারিত ২৫০ মিলিমিটার পুরু ইটের গাঁথুনি পাওয়া যায়নি। পুরোনো ও ছিদ্রযুক্ত বিটুমিন ড্রাম শিট জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার করায় সেগুলো বিভিন্ন স্থানে খুলে পড়ছে। রাস্তার দুই পাশের ঢালে প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট, কম্প্যাকশন ও ঘাসের টার্ফ তৈরির কাজও যথাযথভাবে হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, নির্মাণকাজ চলাকালেই তারা নিম্নমানের কাজের প্রতিবাদ করেছিলেন। এমনকি পিআইও সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি এবং ঠিকাদার নিজের মতো করেই কাজ সম্পন্ন করেন।
স্থানীয় কৃষক আলতাফ শেখ আমার দেশকে বলেন, রাস্তাটি হওয়ায় আমরা খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু সেই আনন্দ বেশি দিন টিকেনি। নিম্নমানের কাজের কারণেই অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে।
মমিন ফকির আমার দেশকে বলেন, আমরা ভালো কাজ করার অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু ঠিকাদার গুরুত্ব দেননি।
আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম আমার দেশকে বলেন, সরকার মানুষের সুবিধার জন্য কোটি টাকা খরচ করেছে, কিন্তু নিম্নমানের কাজের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল মোল্লা অভিযোগ করে আমার দেশকে বলেন, সঠিক তদারকির অভাবেই সরকারি প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়ছে। অভিযোগ করার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারের প্রতিনিধি মো. হাবিবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সরকারি নকশা অনুযায়ী কাজ করা হয়েছে। বৃষ্টির কারণে কোথাও ক্ষতি হয়ে থাকলে তা দ্রুত মেরামত করা হবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আবু বকর আমার দেশকে বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের পর ঠিকাদারকে কাজের মান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল। বর্তমানে বৃষ্টির কারণে কিছু স্থানে ধস দেখা দিয়েছে। দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক বছরের ওয়ারেন্টি থাকায় জামানত ফেরতের আগে সব ত্রুটি সংশোধন নিশ্চিত করা হবে।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস আমার দেশকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে কাজের মান যাচাই করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, শুধু মেরামত নয়—পুরো প্রকল্পের মান যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্বাধীন কারিগরি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments