মোঃ তৌহিদুর রহমান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্সিং সুপারভাইজার মৃদুলা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ডিউটি রোস্টার নিয়ে হয়রানি এবং হাসপাতালের ওটি ব্যবহার করে গোপনে এমআর ও ডিএন্ডসি করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের ৩৫ জন কর্মরত নার্সের মধ্যে ২৯ জন লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এবাদত হোসেনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত ১৪ জুলাই তদন্ত কমিটির সদস্যরা গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। ওই সময় প্রায় ৩১ জন নার্স তদন্ত দলের সামনে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সরেজমিনে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে কয়েকজন নার্স ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বললে তারা নার্সিং সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের কথা জানান। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে মৃদুলা বিশ্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মী রহিমা বেগম (জন্মনাম) অভিযোগ করে বলেন, ‘৫/৭ বছর আগে আমার নিজের এমআর করেছিলেন মৃদুলা আন্টি। তখন আমি দুই হাজার টাকা দিয়েছিলাম। এখানে কাজ করতে আসার পরও প্রায়ই তিনি এসব কাজ করেন। আমাদের এক-দুইশ টাকা দিয়ে পরিষ্কার করতে দেন।’
তার অভিযোগ, হাসপাতালের ওটি কক্ষের চাবি সব সময় নার্সিং সুপারভাইজারের কাছে থাকে। এ কারণে ওটির কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নার্স অভিযোগ করেন, ছুটির আবেদন বা অন্য কোনো প্রয়োজনে নার্সিং সুপারভাইজারের কক্ষে গেলে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে বের হন। তার অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলা, সন্তানসম্ভবা নারীদের সঙ্গেও অশালীন ভাষায় কথা বলা এবং রোগী ও স্বজনদের সামনে সহকর্মীদের অপমান করার ঘটনা ঘটে।
ওই নার্স আরও অভিযোগ করেন, ‘রোগীর সামনে মা তুলে গালি দেওয়া তার সাধারণ ব্যাপার। অতিরিক্ত রোগী দেখিয়ে সেই খাবারের টাকায় তিনি নাস্তা করেন।’
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নার্সিং সুপারভাইজার মৃদুলা বিশ্বাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওটি ও ডেলিভারি রুমে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন সময়ে গোপনে গাইনি চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে এমআর ও ডিএন্ডসি করিয়েছেন। এতে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি রোগীদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী দেখিয়ে খাবারের বিল থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ডাক্তার, রোগী ও রোগীর স্বজনদের সামনে নার্সদের সঙ্গে অপমানজনক ও অবমাননাকর ভাষায় কথা বলা হয়। আয়া ও সুইপারদের সঙ্গেও অশালীন আচরণের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় নার্সদের পরিবার ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলা এবং মিথ্যা অভিযোগে হয়রানি ও ভবিষ্যতে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।
ডিউটি রোস্টার নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে নার্সদের মধ্যে। অভিযোগকারীদের দাবি, যারা নার্সিং সুপারভাইজারের ঘনিষ্ঠ, তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পান। আর যারা তার আচরণ বা অনিয়মের প্রতিবাদ করেন, তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়।
কয়েকজন নার্স অভিযোগ করেন, নার্সিং সুপারভাইজারের আচরণের কারণে কর্মক্ষেত্রে তারা মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। তাদের ভাষ্য, হাসপাতালের সেবাব্যবস্থায় নার্সদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও একজন কর্মকর্তার আচরণের কারণে পুরো নার্সিং বিভাগের কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া অবৈধভাবে ডিএন্ডসি করার জন্য ওটির নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন নার্স। তাদের দাবি, ওটির জন্য আলাদা চাবি নার্সিং সুপারভাইজারের কাছে থাকে।
হাসপাতালের সিনিয়র নার্স আনোয়ারা অভিযোগ করে বলেন, ‘এর আগে আমাকে কম্পিউটারে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই কাজ করার জন্য কম্পিউটার বের করে তার পাশের একটি ছোট কক্ষে, যেখানে বাথরুমও ছিল, সেখানে কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল। আগে তিন-চারজন কাজ করলেও তখন আমাকে ছাড়া আর কাউকে কাজ করতে দেওয়া হতো না। ওই ঘটনায় তিনি ও আমি শোকজ হয়েছিলাম। তখন আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।’
প্রায় ১১ মাস আগে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেওয়া নার্স তন্নি প্রামাণিকও নার্সিং সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে খারাপ আচরণের অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রেগন্যান্ট এবং আমার শারীরিক সমস্যা রয়েছে—এটি জানার পরও আমাকে নিচের ইমার্জেন্সিতে ডিউটি দেওয়া হয়। অন্য সহকর্মীরা সেই ডিউটি করতে চাইলেও আমাকে চাপ দেওয়া হয়েছে। তিনি পরিবার নিয়ে অবমাননাকর কথা বলেন। এমনকি বলেন, এত শিক্ষিত হয়ে এই চাকরি কেন করতে হবে? তিনি সব সময় মানুষকে কষ্ট দিয়ে কথা বলেন।’
তন্নি প্রামাণিক আরও অভিযোগ করেন, নার্সিং সুপারভাইজারের ঘনিষ্ঠ দুজন নার্স রয়েছেন, যারা তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও তারাই বেশি পান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে অভিযোগের পর গঠিত তদন্ত কমিটি গত ১৪ জুলাই হাসপাতালে গিয়ে অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণ করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্ত দলের সামনে প্রায় ৩১ জন নার্স তাদের অভিযোগ ও কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
রাজবাড়ী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন আমি হাতে পেয়েছি। বিষয়টি ঢাকায় ডিজিএফ বরাবর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে নার্সিং সুপারভাইজার মৃদুলা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এদিকে একসঙ্গে এতসংখ্যক নার্সের লিখিত অভিযোগ এবং তদন্ত কমিটির কাছে তাদের বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মপরিবেশ ও রোগীসেবার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিরূপণ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।



