মহান বিজয় দিবস ২০২৫ উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় তিনি এ ভাষণ দেন। আমার দেশ পাঠকদের জন্য ভাষণের পূর্ণ পাঠ তুলে ধরা হলো— প্রিয় দেশবাসী, শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী, নারী-পুরুষ, নবীন-প্রবীণ—আপনাদের সকলের প্রতি আমার আন্তরিক সালাম ও শ্রদ্ধা। আসসালামু আলাইকুম। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে দেশে ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত সকল বাংলাদেশিকে জানাই বিজয়ের উষ্ণ শুভেচ্ছা। আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। ১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর এই দিনে আমরা অর্জন করি কাঙ্ক্ষিত বিজয়। লাখো শহিদের রক্ত ও অসীম ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ ও লাল-সবুজের পতাকা। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধসহ স্বাধীনতার জন্য যুগযুগ ধরে যারা আত্মত্যাগ করেছেন সেইসব বীর শহিদ ও যোদ্ধাদের। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায় এবং সংকটে মুক্তির পথ দেখায়। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের কারণে ম্লান হয়ে পড়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ পেয়েছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশের ভিত গড়ে তুলতে যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা আজ তার সফল পরিসমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছি। আজ এই আনন্দের দিনে গভীর বেদনার সঙ্গে জানাতে হচ্ছে—জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর সাম্প্রতিক হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ওপর আঘাত। তিনি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। সরকার তাঁর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশবাসীর কাছে তাঁর জন্য দোয়া কামনা করছি। এ ঘটনায় জড়িতদের প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পরাজিত ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টদের অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করা হবে। ভয়, সন্ত্রাস কিংবা রক্তপাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না। সবাইকে সংযম বজায় রাখতে ও গুজবে কান না দিতে আহ্বান জানাচ্ছি। তরুণদের রক্ষা করতে হবে, কারণ তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ। নির্বাচন সামনে রেখে পরাজিত শক্তি নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে, কিন্তু আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে তারা ব্যর্থ হবেই। উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ওপর জনগণের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জাতীয় নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা আমাদের সকলের জন্য উদ্বেগের বিষয়। সরকার শুরু থেকেই তাঁর চিকিৎসা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজন হলে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে—জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। তাকে ও মামলার অপর আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ জারি করা হয়েছে। এই সনদের ওপর আগামী নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেছে। এই নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জনগণের ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। নির্বাচন যেন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু হয় সে জন্য সরকার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিচ্ছে। ভোট বাক্স ডাকাতি মানে জনগণের অধিকার হরণ। ভোট রক্ষা করা দেশ রক্ষার সমান দায়িত্ব। প্রবাসী বাংলাদেশিরা এবার প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে এবং পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। আমরা এক নতুন ইতিহাসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে। আসুন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানবিক বাংলাদেশের পথে একসঙ্গে এগিয়ে যাই। সবাইকে আবারও মহান বিজয় দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা। আল্লাহ হাফেজ।



