আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে সমঝোতা নিয়ে শেষ মুহূর্তের দরকষাকষি চলছে। দলটির নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ কোনো ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যাওয়ার বিরোধিতা করলেও নীতিগতভাবে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। তবে এই সমঝোতা জোট আকারে হবে নাকি কেবল আসনভিত্তিক—তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন শুক্রবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে দলটির নির্বাহী কাউন্সিলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে সমঝোতা প্রায় নিশ্চিত হলেও এর ধরন, কতটি আসনে হবে এবং এটি আনুষ্ঠানিক জোট হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, এনসিপির সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং অগ্রগতিও ভালো। তবে কতটি আসনে সমঝোতা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি। এনসিপিকে ৩০টি আসন ছেড়ে দেওয়ার গুঞ্জন তিনি নাকচ করে দেন।
অন্যদিকে এনসিপির একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ৩০ আসনের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও সংখ্যাগত একটি ধারণা পাওয়ার পর আলোচনা এগিয়েছে।
দলের অভ্যন্তরে এই সমঝোতা নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এনসিপির নেতারা বলছেন, অধিকাংশ নেতা-কর্মী এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে। একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় আগ্রহী হলেও ক্ষুদ্র একটি অংশ বিএনপির সঙ্গে জোটের পক্ষে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভেতরের বিরোধিতার কারণে বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এনসিপির অনেক নেতা চাইছেন, জামায়াতের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা হলে তা যেন স্পষ্টভাবে কৌশলগত ও নির্বাচনী হিসেবেই ঘোষণা করা হয়, আদর্শগত কোনো ঐক্য হিসেবে নয়। এনসিপির একজন নির্বাহী কাউন্সিল সদস্য বলেন, প্রার্থীদের নিরাপত্তা, নির্বাচনী সম্ভাবনা এবং বাস্তব কৌশল বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের কোনো সংযুক্তি নেই।
নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি। দুই দলের নেতারাই জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত কতটি আসনে সমঝোতা হবে, তা ওই সময়সীমার কাছাকাছি গিয়েই চূড়ান্ত হতে পারে। কারণ সমঝোতার অংশ হিসেবে উভয় দল থেকেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থী প্রত্যাহার করতে হবে।
এদিকে এনসিপি ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিকে নিয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন এই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। শুক্রবার সকালে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ ইঙ্গিত দেন নেতারা।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম বলেন, এনসিপি ও এবি পার্টি বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা করছে—এমন খবর রাজনৈতিক অঙ্গনে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে জোটের শরিক হিসেবে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি বলেন, খবরটি সত্য হলে তারা আর এই জোটে থাকবে না।
হাসনাত কাইয়ূম অভিযোগ করেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে জোটের সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি বা জামায়াত কেউই এই মুহূর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করছে না এবং এ ধরনের রাজনৈতিক বিভাজনের অংশ হতে চায় না রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট ভেঙে গেছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা করে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে প্রচলিত খবর সত্য হলে কার্যত এই জোট আর অস্তিত্বশীল থাকবে না।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন আগে গণতন্ত্র মঞ্চের অংশ ছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে গত ৭ ডিসেম্বর এনসিপির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটে যোগ দেয় দলটি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।



