মোঃ তৌহিদুর রহমান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর গ্রামের আফসার শেখের ছেলে মো. আশরাফুল ইসলাম (২৪) পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়া বাসের যাত্রী ছিল। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত তিনি নিখোঁজ ছিলেন। দূর্ঘটনার পর থেকেই স্বজনরা নদীপাড়ে অপেক্ষা করছিলেন। উদ্ধারকারী দল সকাল সোয়া ১০টার দিকে আশরাফুলের মরদেহ উদ্ধার করে। প্রিয় স্বজনের নিথর দেহ দেখে পরিবারের সদস্যদের গগণ বিদারী আহাজারিতে পদ্মা পাড়ে উপস্থিত শত শত মানুষের চোখে পানি চলে আসে। তাদের কান্নার রোল আর মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য দৌলতদিয়া ৩নং ফেরি ঘাটে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির অবতারনা হয়। এভাবেই প্রতিটি মহদেহ দেখে স্বজনদের বুকফাঁটা আর্তনাত নদী পারের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মর্মান্তিক বাস ডুবির ঘটনায় সর্বশেষ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে উদ্ধারকারী দল। এর মধ্যে ২৫ জনের মরদেহ ইতোমধ্যে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন। অপর একজনের মরদেহ গ্রহনের জন্য দিনাজপুর থেকে নিহতের স্বজনরা আসছেন।
উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৪ জন পুরুষ শিশু, ৩ জন কন্যাশিশু, ১১ জন নারী এবং ৮ জন পুরুষ রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্যও রয়েছে। রাজবাড়ী শহরের লালমিয়া সড়ক, সজ্জনকান্দা ও দাদশী ইউনিয়নের কয়েকটি পরিবারে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
নিহতরা হলেন রাজবাড়ী পৌরসভার লালমিয়া সড়ক ভবানীপুর এলাকার মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ড মজমপুর এলাকার মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাগড়বাড়ীয়া গ্রামের হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দা এলাকার মৃত ডা. আবদুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), একই এলাকার কাজী মুকুলের ছেলে কাজী সাইফ (৩০), গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের চর বারকিপাড়া গ্রামের রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২), তার মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বিল্লাল হোসেনের ছেলে ফাইজ শাহানূর (১১), রাজবাড়ী পৌরসভার কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার আরব খানের ছেলে আরমান খান (৩১) (বাসচালক), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন (৩০), রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর এলাকার সোবাহান মন্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), একই এলাকার মান্নান মন্ডলের স্ত্রী জোস্ন্যা (৩৫), গোপালগঞ্জ জেলার মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা বেগম (৪০), ঢাকার আশুলিয়া এলাকার মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নুরুজ্জামানের ছেলে আরমান (৭ মাস), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুর রহমান (৬), রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদসী ইউনিয়নের আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), রাজবাড়ী শহরের ভবানীপুর এলাকার ইসমাইল হোসেন খানের ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), রাজবাড়ীর কালুখালীর মজনু শেখের ছেলে উজ্জ্বল শেখ (৫০), একই উপজেলার মদাপুর গ্রামের আফসার শেখের ছেলে আশরাফুল ইসলাম (২৪) এবং রাজবাড়ী সদর উপজেরার বোয়ালিয়া গ্রামের মৃত সানাউল্লাহর ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন (৫৫)।
এর আগে বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ এর একটি যাত্রীবাহী বাস দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে পন্টুনে ফেরির আনলোড হওয়া গাড়ির সাইড দিতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলটি গভীর হওয়ায় উদ্ধারকাজে শুরু থেকেই জটিলতা দেখা দেয়। ঘটনার পরপরই দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে অবস্থানরত উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে ঝড়ো বৃষ্টির কারণে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পুনরায় অভিযান শুরু হয়। প্রায় ৭ ঘণ্টার অভিযানে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করা হয়। ওই সময় বাসের ভেতর থেকে নারী ও শিশুসহ ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বেলা সারে ৩টা পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল ও নিহতদের বাড়িতে শোকের মাতম সৃষ্টি হয়েছে।
দূর্ঘটনার খবর পেয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আল আহসান এমপি, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদ, রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উদ্ধার কার্যক্রম পর্যবেক্ষন করেন।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা বাস যাত্রী সাকিব হোসেন, আব্দুল আজিজ, দেলোয়ার হোসেন জানান, বাসটিতে নারী-শিশুসহ অন্তত ৫৫ থেকে ৬০ জন যাত্রী ছিলেন। ঈদ শেষে কর্মস্থলগামী মানুষের চাপ থাকায় বাসের ৪৬টি আসন পরিপূর্ণ ছিল এবং ইঞ্জিন কভারে ৩জন যাত্রী ছিলে। এছাড়া চালক-হেলপারসহ বেশ কিছু যাত্রীর কোলে শিশুরা ছিল। পন্টুনে ওঠার আগে কয়েকজন যাত্রী নেমে গেলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের মধ্যেই ছিলেন। দুর্ঘটনার পর ৭/৮ জন যাত্রী বাস থেকে বেরিয়ে গেলে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত যাত্রীদের পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও আহত যাত্রীদেরকে ১৫ হাজার টাকা করে অনুদান ঘোষণা করা হয়।
উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া ফায়ার সার্ভিসের ফরিদপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দূর্ঘটনার পর থেকে বিরতিহীন ভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে এখন দূর্ঘটনাকবলিত স্থানে কোন মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ যদি এখনো মিসিং থাকে, তবে স্বজনদের তাদের সাথে যোগাযোগের অনুরোধ করেন তিনি।
বহস্পতিবার দুপুরে বিআইডব্লিউটিসি’র চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শনের এসে জানান, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বাস ফেরিতে উঠার সময় সকল যাত্রীদের নামিয়ে শুধু চালক বাস নিয়ে ফেরিতে উঠার জন্য ইতিমধ্যে তাদের সকল স্টাফদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ফেরিঘাটে পন্টুনে আরো মজবুত ও কার্যকরী ব্যারিয়ার স্থাপন করা হবে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, অতিরিক্ত গতির কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায় বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোঃ রাজিব আল আহসান এমপি বলেন, সহায়তা দিয়েতো আর মানুষকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। যার যায় সেই বোঝে, আসলে কি যাচ্ছে। আমরা লাশগুলো দাফনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিজনকে ২৫ হাজার টাকা করে এবং আহতদের প্রতিজনকে চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হবে। আর যে মানুষগুলো আমাদেরকে ছেড়ে গেছে তাদের সংখ্যা পরিপূর্ণ ভাবে নিরুপন করার পর তাদের পরিবারকে স্থায়ী পূনর্বাসনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত একজনও নিখোঁজ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে।



