দীর্ঘ দেড় যুগ পর দেশে উৎসবমুখর ও মুক্ত পরিবেশে শুরু হচ্ছে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার। বৃহস্পতিবার থেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের এ প্রচারের মাধ্যমে এতদিনের একতরফা নির্বাচনের আড়ষ্টতা কাটিয়ে প্রকাশ্যে ফিরছে ভোটের উৎসব। প্রচারকে সামনে রেখে আজ থেকেই প্রার্থীরা মাঠে নামার প্রস্তুতি নিয়েছেন। এর আগে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিয়োগপ্রাপ্ত রিটার্নিং অফিসাররা ২৯৮ (পাবনা-১ ও ২ বাদে) সংসদীয় আসনে গতকাল বুধবার চূড়ান্ত প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দেন। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা পর্যন্ত প্রার্থীরা তাদের প্রচারের সুযোগ পাবেন। এদিকে, নির্বাচনি প্রচারের প্রথম দিনেই চমক থাকছে বড় দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মসূচিতে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচার শুরু করবেন। অনুরূপভাবে, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও আজ থেকে দেশব্যাপী নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেবেন। দলটি আধুনিক ও ইনসাফ কায়েমের স্লোগান নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তফসিল ঘোষণার পর ভোটের ২১ দিন আগে সব ধরনের প্রচারে বিধি-নিষেধ আরোপ করা আছে। কিন্তু বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তা মানেনি। তবে মূল প্রচার শুরুর থেকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, প্রচারের সময় অবশ্যই আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইকিং করা যাবে। তফসিল ঘোষণার পর নিয়ম ভেঙে আগেভাগেই প্রচার চালানোয় ইতোমধ্যে অনেক প্রার্থীকে শোকজ ও জরিমানা করা হয়েছে। ইসি সচিবালয় জানিয়েছে, মাঠে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি সক্রিয় রয়েছে। তারা নিয়মিত তদারকি করছেন যাতে কেউ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে না পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটির সুপারিশে নির্বাচন কমিশন গতকাল পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ৭৫ জনকে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে। একইসঙ্গে সাতজনের বিরুদ্ধে সামারি ট্রায়াল করে জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে পাবনা-৫ আসনে একজনকে ১০ হাজার টাকা, দুজনকে ৫ হাজার টাকা করে এবং একজনকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একইভাবে, খুলনা-২ আসনে দুজনকে এক হাজার টাকা করে এবং রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পটিয়া) আসনে একজনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ইসি বলছে, ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে ভিন্নমত দিয়েছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মুনিরা খান। আমার দেশকে তিনি জানিয়েছেন, এতদিন যারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, কমিশন চাইলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু কেন নিতে পারেননি বা দুর্বলতা কোথায় সেটা ওনারাই ভালো বলতে পারবেন। শুধু শোকজ নোটিস ও জেল-জরিমানার মধ্যে শাস্তি সীমাবদ্ধÑএটা দুঃখজনক। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে মূল প্রচার শুরু হচ্ছে। এ সময়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। অতীতের মতো ঢিলেঠালা মনোভাব দেখালে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা ইসির জন্য আরো কঠিন হবে। তবে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, আমরা কাউকেই ছাড় দিচ্ছি না। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে আছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজনে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে ভোটের কোনো আগ্রহ ছিল না। একতরফা নির্বাচনের কারণে প্রচার চলত মূলত নিজেদের (আওয়ামী লীগ বনাম বিদ্রোহী) মধ্যে। এবার বিএনপি, জামায়াতসহ রেকর্ড ৪৯টি দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে নামায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে নির্বাচনি ময়দান। বিশেষ করে তরুণ প্রার্থীদের বিপুল অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। এর বিপরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ সমমনা ১১টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন করেছে। ইসির প্রাপ্ত তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১৯৮১ জন প্রার্থী। অর্থাৎ প্রতিটি আসনে গড়ে প্রায় সাত জন প্রার্থী লড়াই করছেন। এবার কোনো আসনেই একক প্রার্থী নির্বাচন করছেন না। ইসির তথ্যনুযায়ী, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিসহ ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী সংখ্যা ১৭৩২ এবং স্বতন্ত্র ২৪৯ মিলিয়ে এবার প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১৯৮১ জন। ৩০০ সংসদীয় আসনে দলভিত্তিক সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি, যার সংখ্যা ২৮৮ জন, দ্বিতীয় অবস্থানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ জন, তৃতীয় সর্বোচ্চ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৪ জন এবং জাতীয় পার্টি-জাপার প্রার্থী সংখ্যা ১৯২ জন। তবে গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ ও বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি) একজন করে প্রার্থী দিয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্য দলগুলো হচ্ছে— লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ১২ জন, জাতীয় পার্টি (জেপি) ১০ জন, কমিউনিস্ট পার্টি ৬৫ জন, জাসদ ছয়জন, জেএসডি ২৬ জন, জাকের পার্টি সাতজন, বাসদ ৩৯ জন, বিজেপি পাঁচজন, খেলাফত আন্দোলন আটজন, মুসলিম লীগ ১৩ জন, এনপিপি ২৩ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম চারজন, গণফোরাম ১৯ জন, গণফ্রন্ট পাঁচজন, আইএফবি ১৯ জন, কল্যাণ পার্টি দুইজন, আইওজে দুইজন, খেলাফত মজলিস ৩৪ জন, ইসলামী ফ্রন্ট ২৬ জন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি সাতজন, মুক্তিজোট ২০ জন, বিএনএফ আটজন, এনডিএম আটজন, বাংলাদেশ কংগ্রেস ১৮ জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ৪২ জন, বাংলাদেশ জাসদ ১১ জন, বিএসপি ১৯ জন, এবি পার্টি ৩০ জন, গণঅধিকার পরিষদ ৯০ জন, নাগরিক ঐক্য ১১ জন, গণসংহতি আন্দোলন ১৭ জন, ডেভেলপমেন্ট পার্টি দুইজন, বিএমজেপি আটজন, লেবার পার্টি ১৫ জন, বিআরপি ১২ জন, এনসিপি ৩২ জন, মার্কসবাদী বাসদ ২৯ জন, জনতার দল ১৯ জন, আমজনতা দল ১৫ জন ও নেজামে ইসলাম পার্টি তিনজন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৪৯ জনসহ মোট ১,৯৮১ জন প্রার্থী। ইসির তথ্যানুসারে, ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২৪ হাজার ৭১৮ জন ভোটার এবার ভোট দেবেন। মোট ভোটকেন্দ্র ৪২,৭৮৯টি, যার মধ্যে ১৩টি অস্থায়ী। ভোটকক্ষ ২,৪৭,৪৮২টি এবং গোপন কক্ষ ৪,৩১,২০৮টি। তফসিল পরবর্তী এই সময়টি প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয়ের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ১০ ফেব্রুয়ারি প্রচার শেষ হয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে রেকর্ডসংখ্যক ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন দেশীয় পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকও থাকছেন ১৮৪ জন এবং বিদেশি প্রতিনিধি ৮৩ জন, যার মধ্যে ৪৭ জন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিক।



