আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে দুই দফা গুম করে রাখা হয়। দ্বিতীয় দফা গুম করে রাখার পর মুক্তির আগে তাকে শর্ত দেওয়া হয়েছে—শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, ডিজিএফআই ও ভারত সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। শর্ত মানলে শেখ হাসিনার অনুমতি সাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হবে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন হাসিনুর রহমান। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি তিনি সাক্ষ্য দেন। অসম্পূর্ণ থাকায় আজ আবার জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে হাসিনুর বলেন, একদিন আমাকে পূর্বের ন্যায় হাত-চোখ বেঁধে ইন্টারোগেশন সেলে নেওয়া হয়। আমাকে ছেড়ে দেওয়ার আট-দশ দিন আগে নতুন একজন অফিসার জিজ্ঞাসাবাদ করে বলেন, আপনার পরিবার আমাদের নজরদারিতে। তারা সাংবাদিক সম্মেলন করেছে ও সেনাপ্রধানসহ বিশিষ্টজনদের সঙ্গে দেখা করেছে। আপনি আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করলে শেখ হাসিনার অনুমতি সাপেক্ষে আপনাকে ছাড়ার ব্যবস্থা করব। মুক্তির দিন পরিষ্কার বলা হয়, ফেসবুক ব্যবহার করবেন না। আপনি যে ডিজিএফআইতে ছিলেন, একথা কাউকে বলবেন না। শর্ত ভঙ্গ করলে আপনাকে আবার গুম করা হবে। তিনি বলেন, একদিন দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট আমার কাপড়-চোপড় নিয়ে আসে। চোখ বেঁধে ও হ্যান্ডকাপ পরিয়ে গাড়িতে তোলা হয়। কিছু দূরে গিয়ে গাড়ি থামে, ১০ মিনিট পর চোখের বাঁধন ও হ্যান্ডকাপ খুলে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটি দ্রুত চলে যায়। আমি চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি, মনে করেছিলাম আমাকে হত্যা করা হবে। তখন আমার মেয়েরা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। বাসা থেকে একশ গজ দূরে আমাকে রেখে যায়। পরে স্ত্রী জানায়, ডিজিএফআই ফোন করে নিচে নামতে বলেছিল। তখন জানতে পারি ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, পরে ব্রিগেডিয়ার আজমিকে আয়নাঘরে দেখার বিষয়টি বড় ভাইকে জানাই এবং অধিকার, আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে অবহিত করি। পরে আল জাজিরা ও নেত্র নিউজকে বিষয়টি জানাই। ২০২২ সালের জুলাইয়ে নেত্র নিউজে আয়নাঘরের প্রতিবেদন প্রকাশ হলে ডিজিএফআইয়ের কর্নেল হাফিজ আমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে হুমকি দেয়। এরপর বাসার সামনে নিয়মিত মোটরসাইকেলে নজরদারি শুরু হয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনে বিভিন্ন জেলায় আমার বিরুদ্ধে ১০টি মামলা করা হয়। একটি মামলায় বলা হয় আয়নাঘরের বিষয় প্রকাশ করায় সরকারের ৫০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। জবানবন্দিতে হাসিনুর বলেন, ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা পালানোর আগে পর্যন্ত আমি মানবেতর জীবন যাপন করেছি। ৫ আগস্টের পর ব্রিগেডিয়ার হাসান, কর্নেল ফেরদৌস আজিজসহ ১৫-২০ জনকে নিয়ে আয়নাঘর ঘেরাও করি। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে আয়নাঘর পরিদর্শন করি এবং কোন বাথরুমে কাকে দেখেছি তা শনাক্ত করি। তখন দেখি অনেক কিছু ভেঙে ও পরিবর্তন করা হয়েছে, দেয়ালের রক্তের চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি প্রতিশোধের জন্য মামলা করিনি, যেন এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি না হয় সে জন্য করেছি। সমগ্র জাতি জানুক কেমন ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। আমার কষ্ট ও ক্ষতির জন্য দায়ী শেখ হাসিনা, তারেক সিদ্দিকী, ডিজিএফআইয়ের ডিজি মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদিন ও অন্যান্য অফিসার। আমি তাদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাই। আগামীকাল বুধবার আবার অবশিষ্ট জেরা করা হবে।



