নিয়োগে অনিয়ম ও নানা কেলেঙ্কারিতে আলোচিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (ইআবি) আবারও এসেছে আলোচনায়। এবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু জাফর খান। অভিযোগ উঠেছে, নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসাতে তিনি গোপনে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অর্থ বিভাগের পরিচালক, মাদ্রাসা পরিদর্শক এবং দুইজন ডিনসহ মোট পাঁচটি পদে নিয়োগ দিতে ইতোমধ্যে পছন্দের প্রার্থীদের অফার লেটার দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে কোটি টাকার লেনদেন এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার কৌশল।
জানা গেছে, নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আগে থেকেই ইআবিতে সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও কাজ করছে। ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লিয়েনে নিয়োগ বন্ধ রেখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রেষণে কর্মকর্তা পদায়নের নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষা করে গোপনে এই নিয়োগ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই গোপন নিয়োগ কার্যক্রমের আওতায় নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এমদাদুল হক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী এবং আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী অফার লেটার পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইতোমধ্যে লিয়েনে ছুটির আবেদনও করেছেন।
অফার লেটার পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এমদাদুল হক ও ড. গোলাম রব্বানী। তারা জানান, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের লিয়েন ছুটির জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে ড. ইদ্রিস আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
যদিও তৃতীয় গ্রেডের এসব পদে লিয়েন বা প্রেষণে নিয়োগের বিধান রয়েছে, অতীতে লিয়েনে নিয়োগকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ ওঠায় ২০২৪ সালে ইউজিসি এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা জারি করে। ওই পরিপত্রে রেজিস্ট্রার, অর্থ পরিচালক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে লিয়েনে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নেয়, ভবিষ্যতে এসব পদে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রেষণে যোগ্য কর্মকর্তা পদায়ন করা হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়েই বর্তমান উপাচার্যের নেতৃত্বে গোপনে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তৎকালীন রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে নিজের ছেলেকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। পরে তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরারের নির্দেশে সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয় এবং ইউজিসি একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে সেই কমিটির প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু জাফর খান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “বিষয়টি আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম।” তবে ইউজিসি ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অমান্য করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, লিয়েন বা প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকলেও ইআবি কর্তৃপক্ষ তা এড়িয়ে চলছিল। সম্প্রতি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগে একজন কর্মকর্তাকে প্রেষণে পদায়ন করা হলে তার যোগদানে শুরুতে বাধা সৃষ্টি করা হয়। পরে মন্ত্রণালয়ের চাপে তাকে যোগদান করানো হয়।
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় সারা দেশে আলিম ও ফাজিল পর্যায়ের প্রায় ১ হাজার ৭০০ মাদ্রাসা তদারকি করে। পাশাপাশি ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের অনুমোদন, পরিদর্শন, পরীক্ষা গ্রহণ ও কমিটি অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকে। তবে এসব কার্যক্রম ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অতীতে একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।



