মঙ্গলবার, জুন ২, ২০২৬
spot_img
Homeসারাদেশদৌলতদিয়া ঘাট বাস টার্মিনালে ঈদযাত্রী নিয়ে বের হতে গুণতে হয়েছে আড়াই থেকে...

দৌলতদিয়া ঘাট বাস টার্মিনালে ঈদযাত্রী নিয়ে বের হতে গুণতে হয়েছে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা

মোঃ তৌহিদুর রহমান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:

ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাট বাস টার্মিনাল থেকে শত শত বাস যাত্রী বোঝাই করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। এ সকল বাস দৌলতদিয়া ঘাট থেকে ছাড়ার পূর্বে নানা নামে হাজার হাজার টাকা চাঁদাবাজির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বাস মালিক-শ্রমিক নেতাদের দাবি, শ্রমিক কল্যাণসহ নানান সামাজিক কাজে ব্যায় সংকুলান করার জন্য এই টাকা আদায় করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার অন্যতম প্রবেশদ্বার রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট। প্রতিদিন এখান দিয়ে শত শত যানবাহন দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করে। বিভিন্ন উৎসবে সেই যানবাহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের চাপকে পুঁজি করে দৌলতদিয়া ঘাটে নানা নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। দৌলতদিয়া ঘাট থেকে যাত্রী বোঝাই করে গন্তব্যে রওনা দিতে প্রতিটি বাসকে গুণতে হয় আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা। বাস মালিক সংগঠন বা শ্রমিক সংগঠনের নামে আদায় করা হয় এই টাকা। রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ ‘ডিপার্সার’ নামে বাসপ্রতি ৫০০ টাকা থেকে হাজার টাকা, সিরিয়াল বাবদ ৪/৫শ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া বাস যাত্রী তুলে দেয়া বাবদ প্রতিটি বাসকে কাউন্টরকে দিতে হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। ইচ্ছেমত টাকা আদায় করা হলেও এই চক্রের বিরুদ্ধে কোন বাসের চালক-সুপারভাইজার কথা বলার সাহস পায় না।
গত ২৭ মে বিকেলে দৌলতদিয়া বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, টার্মিনালজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে দূরপাল্লার বিভিন্ন পরিবহন। ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফেরা মানুষের চাপ সামাল দিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত বাস আনা হয়েছে। তবে এসব বাসের চালক ও সুপারভাইজারদের অভিযোগ, রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ ডিপার্সার নামে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায়, সিরিয়াল বাবদ টাকা আদায় ও বিভিন্ন কাউন্টার থেকে যাত্রী তুলে দেয়া বাবদ আদায় করা হয়। এতে প্রতিটি বাস দৌলতদিয়া বাস টার্মিনাল থেকে বের হতে অন্তত ৩ হাজার টাকা দিতে হয়।
বরিশাল থেকে ঈদের যাত্রী নিতে আসা বাসের সুপারভাইজার মো. ইমন হোসেনের কাছে দৌলতদিয়া ঘাটে তাদের কত টাকা দিতে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ সব কথা বলে লাভ কি? খামাখা শত্রু হতে হয়। আমরা তো যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে চাই না, কিন্তু কি করব? দৌলতদিয়া ঘাট থেকে যাত্রী বোঝাই করে বের হতে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। সেই টাকা তো যাত্রীদের কাছ থেকেই সমন্বয় করতে হয়।’
যশোর থেকে ঈদের যাত্রী নিতে আসা বাসের চাকল মো. রিয়াজ শেখ জানান, তারা এ রুটে বাস চালান না, শুধু ঈদের সময় দৌলতদিয়ায় অতিরিক্ত যাত্রী থাকায় এই সময়ে তারা দৌলতদিয়ায় যাত্রী নিতে আসেন। তিনি বলেন, ‘দৌলতদিয়া ঘাটে ঈদের সময় একটি সিন্ডিকেট কাজ করে। আমরা যদি নিজেরাও বাসে যাত্রী তুলি, তবুও কাউন্টার বাবদ কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়ে। ডিপার্সার বাবদ ৫শ থেকে ৭শ টাকা দিতে হয়। সিরিয়াল বাবদ ৫শ টাকা নেয়। এরপর আবার যদি বাসে অতিরিক্ত যাত্রী থাকে তাহলে তার জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। কি করব, এখানে তো আমরা অসহায়।’
খুলনা মেট্রো-ব ১১-০২৮২ নং বাসের সুপারভাইজার মো. হেলাল মোল্লা বলেন, ‘আমরা ফরিদপুর থেকে এসেছি। এখানে যাত্রী নিতে এসে ৫০০ টাকা ডিপার্সার দিতে হয়েছে। কি আর করব, সবাই যখন দিচ্ছে, তখন আমাদেরও দিতে হচ্ছে। এসময় তিনি ৫০০ টাকার ডিপার্চার শ্লিপও দেখান।’
ঢাকা মেট্রো-ব ১১-০০৩৪ নং বাসের সুপারভাইজার মো. সৈয়দ হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন খাতে আমাদের আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা খচর করে দৌলতদিয়া টার্মিনাল থেকে যাত্রী নিয়ে বের হতে হয়। এখানে সিরিয়াল, কাউন্টার, ডিপার্সার বাবাদ এই টাকা দিতে হয়। এটাই এখানকার নিয়ম। সবাই যেভাবে দেয়, আমরাও সেভাবেই দিতে হয়েছে।’
ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৪৭০৭ নং বাসের চালক মো. হিমায়েত বলেন, ‘আগের ঈদে দৌলতদিয়া ঘাটে বাড়তি টাকা দিতে হয়েছে। প্রতি ঈদেই ২/৩শ টাকা করে বাড়ে। এটা আমার এ ঈদের প্রথম ট্রিপ। দেখি কত দিতে হয়?’
দৌলতদিয়া ঘাট বাস টার্মিনালে দায়িত্ব পালন করা ডিপার্সার বাবদ টাকা আদায়কারী মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি শুধু ৫০০ টাকা ডিপার্সার নিচ্ছি। এটা মালিক সমিতির টাকা। কেন নেয়, কী কারণে নেয়, সেটা মালিক সমিতি জানে। আমি মালিক সমিতির চাকরি করি।’
রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি খোন্দকার মাহমুদুল হক জুয়েল বলেন, ‘ডিপার্সার বাবদ যে টাকা নেয়া হয়, তা শ্রমিকদের কল্যাণসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজ করা হয়। এ ব্যাপারে কোন বাস মালিকের কোন আপত্তি নেই। আর এই টাকা কোন যাত্রীর কাছ থেকে নেয়া হয় না। এ বিষয়ে কোন বাস মালিকের কোন প্রকার অভিযোগ নেই।’ এসময় তিনি তার নিজের বাসের নম্বর দিয়ে বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে দেখেন আমার বাস থেকেও এই টাকা নেয়া হয়।’ তিনি আরো জানান, সারা বছর শ্রমিকরা কাজ করে। কিন্তু ঈদের সময় মৌসুমী বাস কাউন্টার খুলে বহিরাগতরা অর্থ হাতিয়ে নেয়। এটা আমাদের শ্রমিকদের বঞ্চিত করা ছাড়া কিছু না।
এ প্রসঙ্গে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ দিলে অবশ্যই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments