আবদুল্লাহ সামি, কুমিল্লা (উত্তর) জেলা:
সড়ক ব্যবস্থায় যখন সারাদেশে অভাবনীয় উন্নয়ন, তখন কুমিল্লার ঐতিহাসিক সমৃদ্ধ জনপদ বুড়িচং উপজেলার ময়নামতির পাশ দিয়ে বহে যাওয়া গোমতী নদীর তিনটি খেয়াঘাট দুপারের হাজারো মানুষের একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা ।
এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবী গোমতী নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণ করার। অথচ এ ব্রীজের অভাবে কয়েক লক্ষ মানুষের যোগাযোগে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষের। ময়নামতি ইউনিয়নের গোমতীর পাড়ের।মিরপুর, নানুয়ার বাজার, বাহেরচর (মিঘিলাপুর) এলাকার মানুষ অপেক্ষায় থাকে কখন পাড়ে ভীড়বে নৌকা কিংবা নৌকা থাকলেও মাঝিকে হাক ডাক দেয় ওই মাঝি তাড়াতাড়ি আসো। বছরের অন্যান্য সাধারন দিনে-রাতে ডাকের সুর এক রকম হলেও অঝোঁর বৃষ্টি, কুয়াশা কিংবা রাত গভীর হলে ঘর ফেরা মানুষগুলো পারাপারের অপেক্ষায় কখনো আগাম জানিয়ে রাখে অথবা মোবাইল ফোনে ডেকে এনে বাড়ি-ঘরে ফিরছে এখানকার তিনটি খেয়াপাড়ের মানুষগুলো।
ঘাটগুলো তে মানুষের পাড়াপাড়ে যুগের পর যুগ মাঝি কর্মব্যস্ত সময় পাড় করলেও এসব ঘাট অনেকটাই অবহেলিত। নেই রোদে বৃষ্টিতে দাড়ানো বা অপেক্ষর নুন্যতম সুযোগ। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব ঘাট দিয়ে মাঝিরা পারাপার করছেন। আর এটাই তাদেও আয়ের একমাত্র উৎস।
যুগ অনেক পাল্টে গেছে। সড়ক, মহাসড়ক, ফ্লাইওভার, নদীর উপর ব্রীজ সব কিছুই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশের সর্বত্র। কিন্তু শতাব্দি প্রাচীন খেয়াঘাটগুলো সেই মান্ধাতা আমলের ডিঙ্গি নৌকায় ভর করে এপাড়-ওপাড় করছে প্রতিদিন শত শত যাত্রী। জেলা পরিষদের অধীনে থাকা এইসব ঘাটগুলোর সংস্কার বা আধুনিকায়নে যেমন কর্তৃপক্ষের কোন খেয়াল নেই, তেমনি সাধারন কারো চোখে-মুখেও কোন অভিযোগ নেই। প্রতিটি যাত্রী মনে হয় কোনো রকমে এপাড়-ওপাড় হতে পারলেই হলো।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের পূর্বদিক দিয়ে বয়ে গেছে জেলার প্রধান নদী গোমতী। আর এই ইউনিয়নের প্রায় ৪ কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যেই তিনটি খেয়াঘাটের অবস্থান।
মিরপুর খেয়াঘাট- ময়নামতি রানীর বাংলোর পূর্বদিকে প্রায় অর্ধকিলোমিটারেরও কম দূরত্বে মিরপুর খেয়াঘাটের অবস্থান।
ঘাটটিতে কোন যাত্রীছাউনি নেই। মিরপুর অংশে ঘাট সংলগ্ন একটি মসজিদ ও একটি দোকান দুর্যোগকালীন বা রোদে-বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়ার উপায়, ওপাড়ের নৌকা ভিড়ার স্থান ভান্তিতে একটি ছোট আকারের ছাপড়া রয়েছে। এই ঘাটের মাঝি আব্দুল কুদ্দুস। পঞ্চাশ পেরুনো এই মাঝি সকাল ৬ টা থেকে নৌকায় যাত্রীপারাপারে ব্যস্ত থাকেন।
দিনের শুরু থেকে টানা বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে তার কর্ম ব্যস্ততা। নদীর দু’পাড়ের মিরপুর, কাঁঠালিয়া, ভান্তি, কাহেতরা, বালিখাড়া, পূর্বহুরা, ফরিজপুর এলাকার লোকজন চলাচল করে এই ঘাট দিয়ে। পুরাতন একটি ডিঙ্গি নৌকাই এই ঘাট দিয়ে পারাপারের একমাত্র অবলম্বন।
কথা প্রসঙ্গে মাঝি কুদ্দুস জানান, আশপাশের বিভিন্ন স্থানে সরকার পাকা সেতু করে দিয়েছে। এতে করে যোগাযোগ অনেকটা সহজ হয়ে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো মানুষের ভীড় নেই এই ঘাটে। তিনিও চান এইখানে একটি সেতু নির্মানের। ঘাটটির ইজারাদার নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, তিন পুরুষের এই পেশা তিনি এখনো টিকিয়ে রেখেছেন।
প্রতিদিন কমপক্ষে ৭/৮’শতাধিক মানুষ এই ঘাট দিয়ে চলাচল করে। যাত্রীপিছু প্রতিবারে এপাড়-ওপাড় হতে নেওয়া হয় ১০ টাকা।
ইজারাদার আরো বলেন, যে টাকা আয় হয় মাঝির বেতন দেওয়ার পর খুব একটা লাভ হয় না। নানুয়ার বাজার খেয়াঘাট এই ঘাটের মাঝি কামাল হোসেন ওরফে বজলুমিয়া। সকাল ৬ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত তার দৈনিক কাজ। দুই তীরের বুড়বুড়িয়া, বেড়াজাল, শিকারপুর, খাড়াতাইয়া, পূর্বহুরা, রামনগর, বাজেহুরা, বাগিলারাসহ পাশের দুইগ্রামের মানুষের সেতু বন্ধন এই খেয়াঘাটের নৌকা। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩’শতাধিক মানুষ পারাপার হয় এই ঘাট দিয়ে। বলে রাখা ভালো এই ঘাটের মাঝি আর ইজারাদার একই ব্যক্তি। তিনি আরো জানান, এখানকার অনেক পরিবার বছরে এককালীন নৌকা ভাড়া দেয়। এই ঘাটটিতেও নেই কোনো যাত্রী ছাউনি। বাৎসরিক ২০ হাজার টাকায় ইজারা নেওয়া ঘাটটি মাঝির পরিবারের একমাত্র আয়ের অবলম্বন। মিথিলাপুর খেয়া ঘাট (বাহেরচর) কেউ বলে মিথিলাপুর, কেউবা বলে বাহেরচর খেয়াঘাট। ময়নামতি ইউনিয়নের সর্বোত্তরে এই ঘাটটির অবস্থান। মাঝি আব্দুল মালেক দেখতে অনেকটা নিরিহ । ইজারাদারের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করা এই মাঝির বেতন মাত্র দেড়’শ টাকা। সকাল ৬ টা থেকে একটানা রাত ১০ টা পর্যন্ত তার চাকুরীর মেয়াদকাল। প্রতিদিন এই ঘাট দিয়ে ৩’শতাধিক লোক আসাযাওয়া করে। এই ঘাটে নৌকায় নদী এপাড়-ওপাড় হতে মাত্র ৫ টাকা নেওয়া হয়। এই ঘাটের ইজারাদার আব্দুল জলিল জানান, মানুষ জরুরী প্রয়োজন না হলে কষ্ট করে নদী পারাপার হতে চায় না নৌকায় করে।



