জুলাই বিপ্লবের পর পতিত শাসকের পলায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায় ভাঙতে শুরু হলে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত ভয়াবহ বন্দিশালা থেকে ফিরতে থাকেন বহু বছর ধরে নিখোঁজ থাকা মানুষজন। রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা—বিভিন্ন পেশার মানুষদের অনেকে ফিরে এলেও বহুজনের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি। যারা ফিরে এসেছেন, তারা বহন করছেন নির্মম নির্যাতনের দাগ; আর যারা ফেরেননি, তাদের পরিবার আজও অপেক্ষায় দিন গুনছে।
এই অন্ধকার অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসা বাংলাদেশ এখন নতুন পথে হাঁটছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত জাতীয় নির্বাচন ঘিরে এবার দেখা যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য—গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তি এবং গুমে হারিয়ে যাওয়া মানুষের পরিবারের সদস্যরা সরাসরি ভোটের ময়দানে নেমেছেন। কেউ দীর্ঘ বন্দিদশার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে, কেউ হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
দেশের ইতিহাসে গুম এক ভয়াল চিত্র। বিরোধী রাজনৈতিক মত দমনে বছরের পর বছর গুমকে রাষ্ট্রীয় পদ্ধতির অংশ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। গঠিত ‘গুম সংক্রান্ত কমিশন অফ ইনকোয়ারি’র প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে—২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুমের অভিযোগ প্রায় দু’হাজারের কাছাকাছি। কমিশনের হিসাবমতে প্রকৃত সংখ্যা তিন হাজার পাঁচশ’রও বেশি হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্যক্তির এখনো কোনো সন্ধান নেই।
জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত কমিশন আস্তে আস্তে সেই অন্ধকার পর্দা সরাচ্ছে। ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিবরণ উঠে আসছে নির্মম নির্যাতন ও অমানবিকতার প্রমাণসহ। আর সেই ইতিহাস নিয়েই এবার তারা নিজেরা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করছেন।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোরসহ বেশ কয়েকটি আসনে গুমফেরত ব্যক্তি বা গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কেউ রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হয়ে বছরের পর বছর অদৃশ্য ছিলেন, কেউ স্বামী, ভাই বা পরিবারের সদস্যকে হারিয়ে আজও তার কোনো হদিস পাননি। তবুও তারা পিছিয়ে যাননি; বরং জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক বড় পরীক্ষা। কারণ প্রথমবারের মতো গুমের শিকার পরিবার ও গুমফেরতরা সরাসরি নির্বাচনের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। তারা শুধু প্রার্থী নন—রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের জীবন্ত সাক্ষ্য; আর এ নির্বাচন তাদের জন্য শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি ন্যায়বিচার, মানবাধিকার আর গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সংগ্রাম।



