ঢাকা: দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমায় চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে এবং ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে নগদ অর্থ আদায় বাড়াতে লজ্জিত করার পাশাপাশি কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পেশ করা একগুচ্ছ প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—শীর্ষ ঋণখেলাপিদের নাম ও ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করা এবং তাঁদের দেশত্যাগে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ১৮ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত মার্চের ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এই অঙ্ক প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। মূলত আগে লুকিয়ে রাখা ‘খারাপ’ ঋণগুলো হিসাবের আওতায় আনা এবং ঋণ শ্রেণীকরণের কঠোর নিয়ম কার্যকর করার ফলে খেলাপি ঋণের এই প্রকৃত ও ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।
এবিবির একগুচ্ছ প্রস্তাবনা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে পাঠানো এক চিঠিতে এবিবির চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরেফিন এই খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন। চিঠিতে বলা হয়, বড় অংকের ঋণখেলাপিরা যাতে কোনোভাবেই বিদেশ ভ্রমণ করতে না পারেন, সেজন্য তাঁদের ওপর সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে আদালত বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অনুমতি থাকলে ছাড় দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া ঋণখেলাপিরা যাতে কোনো ব্যবসায়িক সমিতি, চেম্বার বা সামাজিক সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, তা আইনগতভাবে নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সামাজিক বর্জনের ডাক মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এবিবির এই পদক্ষেপকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, “নব্বইয়ের দশকে আমরা বিদেশি ব্যাংক এবং এমনকি সংসদেও খেলাপিদের নাম প্রকাশ করতে দেখেছি। এটি একটি যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। যারা জনগনের আমানত ফেরত দিচ্ছে না, তারা কীভাবে নীতিনির্ধারণী সেমিনারে যোগ দেন বা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকেন? তাঁদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্মসূচি থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত।”
ব্যাংকাররা মনে করছেন, শুধুমাত্র আইনি প্রক্রিয়া দিয়ে এই বিশাল অংকের টাকা উদ্ধার সম্ভব নয়। তাই খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট এবং তাঁদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করার মাধ্যমে একটি কঠোর বার্তা দেওয়া জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করলে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।



